তরুণ উদ্যোক্তা মো. রাইসুল উদ্দীন সৈকত। সাফল্যের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছেন। বর্তমানে তিনি অ্যালবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান। নির্বাচিত সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং হ্যারিটেজের। সফলতার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনালের। তরুণ উদ্যোক্তাদের নিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর স্বপ্ন দেখছেন তিনি। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিয়ে যেতে চান উচ্চতায়। তার সঙ্গে কথা বলেছেন শিহাব উদ্দীন
অ্যালবিয়ন গ্রুপের শুরুর কথা বলুন।
অ্যালবিয়ন গ্রুপের মূল উদ্যোক্তা আমার বাবা আলহাজ নিজাম উদ্দীন। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রামে ছোট একটি ফ্যাক্টরি দিয়ে শুরু। শুরুর পথটা আজকের মতো এত মসৃণ ছিল না। ব্যবসায় দাঁড় করাতে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছে বাবাকে। বাবার অক্লান্ত পরিশ্রমে তিল তিল করে গড়ে উঠেছে আজকের অ্যালবিয়ন গ্রুপ। ২০০৬ সালে আমি অস্ট্রেলিয়া থেকে পড়াশোনা শেষ করে বাবার ব্যবসার হাল ধরি। বর্তমান বাজারে আমাদের ৩০০টি পণ্য রয়েছে। ভবিষ্যতে দেশের বাইরে ওষুধ রপ্তানির পরিকল্পনা আছে। ঔষধ শিল্পের পাশাপাশি অ্যালবিয়ন পরিবারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে অ্যালবিয়ন অ্যানিমেল হেলথ লিমিটেড, অ্যালবিয়ন কনজ্যুমার প্রোডাক্ট লিমিডেট, মার্লিন ফার্মা লিমিটেড গড়ে ওঠেছে। দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর অ্যালবিয়ন গ্রুপ সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করছে। আমরা ভোক্তাদের শতভাগ সন্তুষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছি।
বর্তমানে ঔষধ শিল্পের সমস্যাগুলো কি কি?
আমরা যারা ঔষধ শিল্পের সঙ্গে জড়িত তারা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই ব্যবসায় টিকে আছি। বর্তমানে এই ব্যবসায় টিকে থাকা একটা চ্যালেঞ্জ। এ শিল্পে যে হারে বিনিয়োগ করতে হয় সে হারে অন্য ব্যবসায়ের মতো দ্রুত মুনাফা আসে না। একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত উদ্যোক্তাকে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে অনেকে এ ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করেও কিছুদিন পর নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। দেশে আগে ছোট-বড় অনেক ফ্যাক্টরি ছিল, এখন কিছু কিছু বন্ধ হয়ে গেছে। এই শিল্পের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে উৎপাদন খরচ বেশি পড়ে। সরকার যদি কাঁচামাল দেশে উৎপাদন করতে পারে তাহলে আর বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হবে না। উৎপাদন খরচও অনেক কমে যাবে। তাই সরকারের প্রতি অনুরোধ থাকবে ঔষধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনের ওপর নজর দেওয়ার। তাছাড়া সরকার যদি এ খাতের ব্যবসায়ীদের কম সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে অনেকেই এই শিল্প স্থাপনে আগ্রহী হবে। ঔষধ কারখানা পরিচালনার জন্য সরকারের যে নীতিমালা রয়েছে সেই নীতিমালা বড় ফ্যাক্টরিগুলো অনুসরণ করলেও ছোট ফ্যাক্টরিগুলোর জন্য অনুসরণ করা কঠিন। তাই নীতিমালাও কিছুটা শিথিল করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
এই শিল্পের সম্ভাবনা কতটা?
এই শিল্পের অপার সম্ভাবনা আমাদের দেশে। দেশের কয়েক লাখ মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমাদের দেশের ওষুধ এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। সরকার প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। আন্তর্জাতিক পরিম-লে এ শিল্পের কারণে দেশের সুনাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী ফার্মাসিস্ট, কেমিস্ট হিসেবে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ছেন। দেশে কর্মসংস্থানেরও বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
বাজারে মানহীন ওষুধে সয়লাব। এ ব্যাপারে কি বলবেন?
কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই কাজগুলো করে থাকে। প্রশাসন যদি আরো তৎপর হয়, নজরদারি বাড়ায়, তাহলে মানহীন ও ভেজাল ওষুধ বন্ধ করা সম্ভব। ঔষধ প্রশাসনের মনিটরিং সেলকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে।
চলমান হরতাল-অবরোধে ব্যবসায়ীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। আপনি কি মনে করেন?
হরতাল-অবরোধের কারণে অর্থনীতির সবখাতে প্রতিদিন তিন হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতি সামাল দেওয়া অনেক দুরূহ। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে অনেকদূর এগিয়েছিল কিন্তু হরতাল-অবরোধের কারণে তা থেকে অনেক পিছিয়ে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
ব্যবসায়ের পাশাপাশি আপনি তো বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করছেন?
আমি মনে করি সমাজের মানুষের প্রতি আমার কিছু দায়দায়িত্ব আছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই কাজগুলো করি। আমি চট্টগ্রামের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। আমাদের অ্যালবিয়ন গ্রুপ প্রতি মাসে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় চিকিৎসা ক্যাম্প করে থাকে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ ও বাৎসরিক বৃত্তি প্রদান করে থাকে। প্রতি বছর উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করে। এছাড়াও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য নিজের সাধ্যমতো কিছু করার চেষ্টা করি।
তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে কি বলবেন?
বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে অনেক সৃজনশীলতা রয়েছে। আমি মনে করি সঠিকভাবে পরিচর্যা ও সহযোগিতা পেলে এরা যে কেউ বিল গেটসের মতো বড় উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য পরিকল্পনামাফিক কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্য সহকারে কাজ করতে হবে। সব সময় উদ্যোগী মনোভাব জাগ্রত রাখতে হবে। ঝুঁকি নিয়ে সব প্রতিকূলতাকে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।-সাপ্তাহিক এই সময়-এর সৌজন্যে।