logo ০৪ এপ্রিল ২০২৫
তিস্তা চুক্তি ঝুলিয়ে দিয়ে অন্যায় করা হচ্ছে: আইনুন নিশাত
২৪ এপ্রিল, ২০১৫ ০০:০৭:৩৩
image


তিস্তার পানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতে জলাধার নির্মাণ করে বর্ষার পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ ড. আইনুন নিশাত। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, ‘তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি। বিষয়টি ঝুলিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে।’ তবে এই বিশেষজ্ঞের মত হচ্ছে, যা কিছু করার ভারতের সহযোগিতা নিয়েই করতে হবে। আর ভারতেরও উচিত এ ব্যাপারে আন্তরিক মনোভাব দেখানো।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাবিবুল্লাহ ফাহাদ

তিস্তার পানি প্রবাহের আসল চিত্রটা কী?

তিস্তার বিষয়টি তিনটি পর্যায় বুঝতে হবে। তিস্তাতে বর্ষাকালে প্রচুর পানি আসে এবং এর প্রবাহ আড়াই থেকে তিন লাখ কিউসেকে পৌঁছালে তিস্তা এলাকায় বন্যা এবং নদী ভাঙন হয়। জুন-জুলাই ও আগস্টে প্রচুর পানি আছে, যা আড়াই থেকে সাড়ে তিন লাখ কিউবিক ফিট পার সেকেন্ড। দ্বিতীয় পর্যায় হচ্ছে এই পরিমাণটা নেমে আসে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। তখন ২৫ থেকে ৩০ হাজার কিউবিক ফিট পার সেকেন্ডে। তৃতীয় ফেব্রুয়ারি-মার্চে এটা পাঁচ থেকে ছয় হাজারে নেমে আসে। এই প্রাকৃতিক অবস্থা নিয়ে আমরা নদীর কথা বলছি।

তিস্তা ব্যারেজের ওপর নকশা প্রণয়নের সময় প্রেক্ষাপট কী ছিল?

তিস্তা ব্যারেজের ওপর প্রকল্প নকশা চূড়ান্ত হয় ১৯৪৪ সালে। তখন অবিভক্ত ভারতের প্রধান ফসল ছিল আমন ধান। আমন ধানের জন্য চাহিদা হচ্ছে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। তখন মাথা ব্যথা ছিল বর্ষাকালে যেন এত পানি না আসে।

পানি এলে সমস্যা কী ছিল?

পানি এলে দুর্বলস্থান উত্তরের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধায় বন্যা ও নদী ভাঙন হয়। তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল বন্যা ব্যবস্থাপনা। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পানি লাগত।

দেশ ভাগ হওয়ার পর কী ধরনের পরিকল্পনা করা হয়?

দেশ ভাগ হওয়ার পর ভারত তার অঞ্চলের একটা পরিকল্পনা করে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পানি দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশ সরকারও এ ধরনের একটি পরিকল্পনা করে। তখন পূর্ব পাকিস্তান। বোরো ধান ছিল না। শীতকালীন ফসল এসেছে ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে।

পানির দরকার আসলে কোন সময়টাতে?

তাহলে আমাদের পানির প্রয়োজন হচ্ছে পুরনো পদ্ধতিতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। এখনকার চাষাবাদের কথা মনে করলে পানির দরকার ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত।

বর্ষাকালের সমস্যা এখনো কাটেনি...

বর্ষাকালের সমস্যাটার কথা বলছি, ওই সময়ে সাড়ে তিন লাখ কিউবিক পার সেকেন্ড পানি আছে। ভারতের সহযোগিতা ছাড়া এই পানি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়?

উজানে জলাধার নির্মাণ করে বর্ষার পানিটা ধরে রাখলেই এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। তিস্তায় যে নদী ভাঙন হয় সেই কথা আমরা ভুলে যাচ্ছি।

বর্ষার পানি ধরে রাখার উপায় কী?

দ্বিতীয় পর্যায়ের সমস্যাটা হচ্ছে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। ভারতের সবচেয়ে বেশি পানি গ্রহণ করার ক্ষমতা ১৬ হাজার কিউসেক। উচ্চ পানি প্রবাহের সমাধান করা সম্ভব হবে না, যদি না ভারত সহযোগিতা করে। বর্ষার পানি কাপ্তাই বাঁধে যেমন করে ধরে রাখা আছে, এভাবে ধরে রাখতে হবে তিস্তার পানি। এটা সম্ভব।

বাংলাদেশ ও ভারতের পানির চাহিদার হিসাবটা...

মাঝারি প্রবাহের সময় পানি থাকে ২৪  থেকে ২৫ হাজার কিউসেক। এখন ভারতের একার চাহিদা ১৬ হাজার কিউসেক। আমাদের চাহিদা হচ্ছে আট হাজার কিউসেক। দুই দেশ মিলিয়ে চাহিদা ২৪ হাজার কিউসেক। তাহলে মোটামুটি পানি আছে। কোনো বছর একটু কম হতে পারে।

তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিটা কেন প্রয়োজন?

সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বাংলাদেশের চাহিদা অনুযায়ী আট হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন। ভয় হচ্ছে ভারত আরও ছয় হাজার কিউসেক নেওয়ার তাল করছে। এটা যদি হয় তাহলে তার চাহিদা হয়ে যাবে ৩০ হাজার কিউসেক। আছে ২৫ হাজার কিউসেক। তাহলে ভারত সবটা খেয়ে ফেলবে। আমাদের কি কিছুই দেবে না? এটা নিয়েই আমরা চুক্তি চাই। যেন সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আমার পানিটা আমি পাই।

ডিসেম্বরের পরে পানির প্রবাহ কম থাকে...

ডিসেম্বরের পরের পানি চলে গেছে পাঁচ থেকে সাত হাজার কিউসেকে। ভারতের চাহিদা ১৬ হাজার কিউসেক। এখন যদি ভারত একফোঁটা পানি নাও নেয় তাহলেও তো আমাদের চাহিদা আট হাজার কিউসেক পূরণ হয় না। ভারত যদি পুরোটা নেয় তাহলে আমাদের ভাগ্যে কিছুই জুটবে না।

শুকনো মৌসুমে যে পানি পাই এটাকে কাজে লাগানো কতটুকু জরুরি?

শুকনো মৌসুমে যে পানি আমরা পাই সেটা কাজে লাগাতে হবে। এতে দুটি ফ্যাক্টর। আগে আমরা উজানের দেশ ও ভাটির দেশের সঙ্গে পানি ভাগ করতাম। এখন আমরা বুঝতে শিখেছি পরিবেশের জন্য, মাছের জন্য ও কচ্ছপের জন্য পানি লাগে। নদীর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য পানি লাগে। এটাকে বলা হয় ইকো ফ্লো বা ইকোলজিক্যাল ফ্লো। ভারতের অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনাতে ইকো ফ্লো রাখা হচ্ছে। আমরাও বলছি নদীর ২০ থেকে ৩০ ভাগ প্রবাহ শুকনো মৌসুমে নদীকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

ভারতের সঙ্গে ফারাক্কা নিয়েও চুক্তি হয়েছে...

ফারাক্কাতে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কোনো চুক্তি ছিল না। তখন চুক্তি থাকলে যতটুকু পানি পেতে পারতাম তারা সেইটুকু পানি ছাড়ত বলে দাবি করে। আমরা মানি কি না মানি সেটা পরের কথা। এই বছর আমরা অতি দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, ভারত পুরোটা নিয়ে নিচ্ছে। যেটা নীতি-বিরুদ্ধ। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখানে তাদের দাদাসুলভ আচরণ করছে।

তিস্তা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে বলা হচ্ছে...

তিস্তার পানি তো শুকিয়ে যাচ্ছে না। আপনি যদি পানি তুলে নিয়ে যান তাহলে তো শুকিয়ে যাবেই। গজলডাঙ্গা পয়েন্টে তো কোনো পরিবর্তন হয়নি। সিকিম যখন জলাধারগুলো চালু করবে তখন পরিবর্তন হবে। তখন শুকনো মৌসুমে পানি বাড়লে বর্ষা মৌসুমে কমবে। আমরা তো তাই চাই।

২০১১ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে চুক্তি সই হয়েছে। সেখানে কী বলা ছিল?

দুই দেশের একটা দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা চুক্তি সই হয়েছিল ২০১১ সালে। সেখানে বলা আছে ভারত এবং বাংলাদেশ নদী ও অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলবে। প্রতিটি নদীর জন্য আলাদা হিসাব-নিকাশ করতে হবে। অববাহিকার ক্ষেত্রেও একই করতে হবে।

নদী ও অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা কীভাবে হওয়া দরকার?

তিস্তা নদী ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখানে ভুটান, চীন, নেপাল কেউ নেই। ভারতের সিকিম রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জেলিং অঞ্চল এবং বাংলাদেশ। তাহলে এই পুরোটা মিলে একটা পরিকল্পনা করতে হবে।

ওপারে পানি সংরক্ষণ করে বাংলাদেশের বন্যা সমস্যা সমাধান করার উপায় কী?

সিকিমে জলাধার নির্মাণ করে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ধরে রেখে বাংলাদেশের বন্যা সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। এতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। দ্বিতীয় হচ্ছে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে যখন পানি নিয়ে টানাটানি হয় সেটাও মেটানো সম্ভব বর্ষার পানি ধরে রাখা গেলে। তাছাড়া শুকনো মৌসুমে যতটা পানি পাওয়া যায়, দুই দেশ সেটি যৌক্তিকভাবে ভাগ করে নেবে। এই যৌক্তিকের কোনো সূত্র নেই। দুই দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

পানি ধরে রাখার জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি দরকার?

ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই কাজটি করতে গেলে উজানে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। বাঁধ, জলাধার এগুলো লাগবে। বাংলাদেশ এটার উপকার ভোগ করতে চাইলে এর দায়ভারও বহন করা উচিত। এটা রাজনীতিবিদদের বিষয়। তারা যদি ফ্রেম ওয়ার্ক দিয়ে দেয়, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী যেহেতু গাইড লাইনটা তৈরি করেছেন, সেটাকে বাস্তবায়ন করার জন্য দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কারিগরি মন্ত্রণালয় উদ্যোগী হবে বলে আমি আশা করি।

তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এত গুরুত্বপূর্ণ হলো কেন?

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে তিস্তা নিয়ে চুক্তি কীসের? আমি একটা স্বাধীন দেশের লোক, স্বাধীন দেশের সঙ্গে কথা বলছি, এটা কোনো অংশের সঙ্গে কথা বলছি না। এটা তো বাংলাদেশ-ভারতের ব্যাপার। এখানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আসল কোত্থেকে?

মমতা ব্যানার্জি তিস্তা নিয়ে বেশ আগ্রহী মনে হচ্ছে...

তিনি তো আগ্রহী হননি। তিনি তো পানি ছাড়ছেন না। অন্যায়ভাবে পানি প্রত্যাহার করছেন। এটা খবরের কাগজেও সেভাবে উঠে আসেনি। তিস্তার পানি প্রবাহ নিয়ে ১৯৫২ সাল থেকে আলোচনা শুরু হয়েছে। কাজেই যে জটিলতাগুলো আছে এগুলো রাজনৈতিক, কারিগরি নয়। রাজনীতিটা আমরা অনুমান করতে পারি।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে দিল্লি সরকারের সম্পর্কের টানাপড়েনের কথা বলা হয়...

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের হয়ত কোনো দ্বন্দ্ব আছে। কেন্দ্রীয় সরকার যদি ঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার যদি সেটা গ্রহণ করে তাহলে তো কোনো সমস্যা থাকে না।

পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক খারাপ থাকতে পারে, তাই বলে বাংলাদেশ ভুগবে কেন?

এই বিষয়টি ঝুলিয়ে দিয়ে আমি মনে করি বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত হয়ে আছে। এখন বাকি আনুষ্ঠানিকতা।- সাপ্তাহিক এই সময়-এর সৌজন্যে।