চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে সদ্য সাবেক হওয়া মেয়র এম মনজুর আলম একসময় আওয়ামী লীগের সার্বক্ষণিক সহযাত্রী ছিলেন। এক সময় তিনি নগরীর উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ড থেকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলরও নির্বাচিত হন।
কিন্তু ২০১০ সালের নির্বাচনে হঠাৎ তিনি দল পাল্টে বিএনপির সমর্থন নিয়ে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীকে প্রায় ৯৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেন। সে সময় তিনি নগরীর প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি দেন। যা তিনি পূরণে ব্যর্থ বলে সমালোচনার ঝড় বইছে এখন।
এ ছাড়া বিএনপির সমর্থন নিয়ে মেয়র হলেও বিএনপির রাজনৈতিক আন্দোলনে তার প্রত্যক্ষ কোন ভুমিকা নেই বলে অভিযোগ তুলেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। ফলে মেয়র প্রার্থী হিসেবে বিএনপির সমর্থন পাওয়া নিয়েও সংশয় ছিল এবার।
তবু অনেক হিসাব-নিকাশ ও কালক্ষেপণ শেষে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচনে উন্নয়ন আন্দোলনের ব্যানারে দ্বিতীয় বারের মতো বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী হন এম মনজুর আলম।
কিন্তু এ নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে যেমন অসন্তুষ্টি তেমনি বিগত ৫ বছরে জলাবদ্ধতা নিরসনসহ নগরীর উন্নয়নে ব্যর্থতার বিষয়ে নানা সমালোচনা চলছে ভোটার ও প্রতিপক্ষ প্রার্থীর অনুসারীদের মাঝে। যা নিয়ে গত ২৪ এপ্রিল শুক্রবার রাতে নগরীর উত্তর কাট্টলীস্থ নিজ বাসভবনে ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা হয় এম মনজুর আলমের। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক মো. ইব্রাহিম খলিল।
ঢাকাটাইমস: বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সমর্থন পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র প্রার্থী হলেন। সে হিসেবে প্রচারণায় সাড়া পাচ্ছেন কেমন? এক্ষেত্রে পার্থক্যই বা কতটুকু।
মনজুর আলম: প্রথমবারের চেয়ে এবার সাড়া পাচ্ছি অনেক বেশি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা এবার আমাকে মেয়র নির্বাচিত করার জন্য গতবারের চেয়ে আরো বেশি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন। সাধারণ ভোটারের সাড়াও পাচ্ছি ব্যাপক।
ঢাকাটাইমস: গত নির্বাচনে নগরীর প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় ভোটাররা ভোট দিয়ে আপনাকে মেয়র নির্বাচিত করেন। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি পূরণে আপনি ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে ভোটারদের মনোভাব ও আপনার প্রতিক্রিয়া কী ?
মনজুর আলম: ভোটাররা জানেন এবং বুঝেন। বিএনপি সমর্থিত মেয়র হওয়ায় জলাবদ্ধতা নিরসনসহ নগরীর উন্নয়নের জন্য সরকারি কোন সহায়তা আমি পাইনি। এরপরও কর্পোরেশনের আয় থেকে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খনন, নালা-নর্দমা তৈরীসহ উন্নয়নমুলক কাজ করেছি। ফলে নগরীতে এখন স্থায়ী জলাবদ্ধতা নেই। বৃষ্টি হলে সৃষ্টি হয় জলজট। যা দুই-তিন ঘন্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। এ নিয়ে সাধারণ ভোটারের মাঝে কোন ক্ষোভ নেই। প্রতিপক্ষরাই এটাকে পুঁিজ করে নির্বাচনী মাঠ গরম করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এতে তেমন কোন সফলতা আসেনি বলে মনে করি আমি।
ঢাকাটাইমস: বিগত বর্ষায় জলাবদ্ধতায় ২-৩দিন বা আরো বেশি সময় পানিতে ডুবে থাকতে হয়েছে। নানা দুর্ভোগের শিকার হয়েছে মানুষ। যেটিকে এড়িয়ে দুই-তিন ঘন্টা জলজটের কথা বলাটা কী মিথ্যা নয় ?
মনজুর আলম: না এটাই সত্য। দুই-তিন দিন জলাবদ্ধতা কখনো হয়নি। প্রবল বৃষ্টি হলে বন্যা হয়। এটি দুর্যোগ। যেটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। এতে হাত দেওয়ার ক্ষমতা কারো নেই। এটি মোকাবেলার বিষয়। এ রকম বন্যা আমেরিকায়ও হয়।
ঢাকাটাইমস : এবার ঘোষিত ইশতেহারে আওয়ামী লীগ সমর্থিত নাগরিক কমিটির প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিন জলাবদ্ধতা নিরসন ও ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধমুক্ত ডিজিটাল নগরীর মাধ্যমে চট্টগ্রামকে মেগাসিটি করার কথা বলছেন, সেখানে আপনি এসবকে প্রধান্য না দিয়ে সন্ত্রাসমুক্ত উন্নত নগরীর কথা বলছেন। এ ব্যাপারে একটু খোলাসা করে বলবেন কি?
মনজুর আলম : কোন প্রার্থীর ইশতেহার নিয়ে আমার বলার কিছুই নেই। আর আমি মনে করি নগরীর জলজটের যে সমস্যা আছে তা ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরসন করা হবে। কিন্তু নগরীতে এর চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে সন্ত্রাস। দলবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা রকম সন্ত্রাসী কর্মকা-ের শিকার মানুষ। যা আমি নিরসনের উদ্যোগ নেব। চট্টগ্রামকে একটি শান্তির শহরে পরিণত করব। আর নগরবাসীর প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কর্মকা- চালানো হলে তা অবশ্যই উন্নত নগরীতে পরিণত হবে।
ঢাকাটাইমস : ইশতেহারে আপনি রেখেছেন ৫৪ দফা, আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিন রেখেছেন ৩৬ দফা। এ নিয়ে আপনার মতামত কী? আপনি নিজেই তো নির্বাচনী প্রচারণার পথসভায় বলেছেন, যারা বেশি প্রতিশ্রুতি দেয় তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয় না।
মনজুর আলম : হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি প্রতিশ্রুতি বেশি দিলে তা বাস্তবায়ন হয় কম। এক্ষেত্রে ৩৬ দফায় ৫৪ দফার চেয়েও অনেক বেশি প্রতিশ্রুতি রয়েছে। যার অধিকাংশ গালগল্প ছাড়া কিছুই নয়। আমি ইশতেহারে যা প্রতিশ্রুতি রেখেছি তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করব।
ঢাকাটাইমস : গত ৫ বছরে মেয়র হিসেবে আপনি নিজেকে কতটুকু সফল বলে মনে করেন ?
মনজুর আলম : আমি সফলও বলব না, ব্যর্থও বলব না। কারণ মেয়র হিসেবে আমি কাজ করে গেছি নগরবাসীর জন্য, কাজের মধ্যে ছিলাম। কতটুকু করতে পেরেছি তা মূল্যায়ন করবেন নগরবাসী। আমার যোগ্যতা ও কাজের পরীক্ষা হবে এই নির্বাচনে। এ পরীক্ষায় বোঝা যাবে, আমি কতটুকু সফল।
ঢাকাটাইমস : আপনি তো বলছেন বিএনপি সমর্থিত মেয়র হওয়ায় আপনি সরকারী সহায়তা পাননি। আবার মেয়র হওয়ার পরও তো সরকারি সহায়তা পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা নেই। মেয়র হলে এ অবস্থায় আপনি নগরীর উন্নয়নে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কিভাবে বাস্তবায়ন করবেন? এসব জেনে শুনে আপনি মেয়র হওয়ার জন্য আবারও লড়াই করছেনই বা কেন ?
মনজুর আলম : সহায়তা পায়নি এটি তো মিথ্যা না। হয়তো আবার মেয়র হলেও সরকার সহায়তা দিবে না। আমার চেষ্টা থাকবে সরকারি সহায়তা আদায়ের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকা- চালানো। এ জন্য কর্পোরেশনের আয়ও বাড়াতে হবে। যা দিয়ে নগরীর উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা করা হবে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সততা ও নিষ্ঠার সাথে কর্পোরেশন পরিচালনা করা। যার সাথে নগরবাসীর স্বার্থও জড়িত রয়েছে। নগরবাসীর স্বার্থেই আমি আবার মেয়র হওয়ার লড়াইয়ে নেমেছি।
ঢাকাটাইমস : চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে আরো শক্তিশালী করার বিষয়ে সরকারের কাছে আপনার বিশেষ কোনো প্রস্তাব থাকবে কি?
মনজুর আলম: নগরীর অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সিটি করপোরেশনের নিজস্ব উদ্যোগ। পাশাপাশি চাই সরকারের আন্তরিকতা ও সহযোগিতা। এ উন্নয়ন একা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়। সারা বিশ্বে যত সিটি করপোরেশন আছে সবই চলে সিটি গভর্নমেন্ট কনসেপ্টে।
আমাদের করপোরেশনে সিটি কো-অর্ডিনেশন কমিটি ছিল। সেটাও কার্যকর করা যায়নি। এই কনসেপ্টকে যে যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করুন না কেন, নগরীর উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ের বিকল্প নেই।
ঢাকাটাইমস: অনেকেই আপনাকে দানশীল ভদ্রলোক হিসেবে প্রশংসা করে থাকেন। পাশাপাশি প্রশাসনিক ক্ষেত্রে আপনার দুর্বলতার চরম সমালোচনা করেন। এ বিষয়টিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
মনজুর আলম : আমার সমালোচনা বাইরে থেকে শুনেছেন। এ সমালোচনার যথার্থ জবাব দিতে পারবেন সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই। তাঁরা ভালো বলতে পারবেন আমার প্রশাসনিক দক্ষতা ও দুর্বলতা। এ ব্যাপারে আমি ভালো বলতে পারব না।
ঢাকাটাইমস : আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিনকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কিভাবে দেখছেন?
মনজুর আলম : নাছির ভাই একজন রাজনীতিবিদ। তিনি ছাত্ররাজনীতি করেছেন। বর্তমানে বড় একটি দলের মহানগর সাধারণ স¤পাদক। তাই তাঁকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতো নাছির ভাইও হেভিওয়েট প্রার্থী। নাছির ভাইয়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। সেদিক থেকে তিনি আমার চেয়ে অনেক এগিয়ে। আমি বয়সে বড় হলেও তাঁর থেকে অনেক কিছুতে পিছিয়ে।