logo ০৪ এপ্রিল ২০২৫
দুর্বলতার জন্য বারবার খেসারত দিচ্ছে বিএনপি
১৩ মে, ২০১৫ ১১:৫১:০২
image

সাবেক সেনা কর্মকর্তা, সাবেক মন্ত্রী আ স ম হান্নান শাহ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র স্থায়ী কমিটির সদস্য। যিনি ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির উপদেষ্টা। সবশেষ দায়িত্ব পালন করেছেন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণের সমন্বয়ক হিসেবে। বিএনপির আন্দোলন, আগামী পরিকল্পনাসহ সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গত সোমবার তিনি কথা বলেন ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে। তার মহাখালীর ডিওএইচএসের নিজ বাসায় সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ঢাকাটাইমসের নিজস্ব প্রতিবেদক বোরহান উদ্দিন


ঢাকা টাইমস: বারবার শুরু করে হঠাৎ করে বিএনপির আন্দোলন বন্ধ করে দেয়ার কারণ কী?


হান্নান শাহ: আন্দোলন বন্ধ হয়নি।এটা যারা বলে আমি বলবো তাদের অভিজ্ঞতার অভাব আছে। এরশাদের বিরুদ্ধে নয় বছর আন্দোলন চলেছে। গণবিচ্ছিন্ন বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপিসহ যেসব রাজনৈতিক দল আন্দোলন করছে এর অন্যতম দাবি হলো জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা। কারণ গত ৫ জানুয়ারির পর ২৮ এপ্রিল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকার ও আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন কিভাবে হাতে হাত মিলিয়ে কিভাবে নির্বাচনে প্রত্যেকটি নীতিমালা ভঙ্গ করেছে তা দেশের মানুষ দেখেছে। এমনকি বিশ্ববাসীও দেখেছে। এটাই বাংলাদেশে প্রথম যে নির্বাচন কমিশন নিজের দায়িত্ব সম্পূর্ণ সরকারের নির্দেশমতো পালন করেছে। আমরা জানি সংবিধান অনুযায়ী এরা একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান আর সরকারের দায়িত্ব কমিশন যা চাইবে সেই সহযোগিতা করা। আমরা সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন কলাকৌশল করে সেনা মোতায়েন করেনি। কারণ সেনাবাহিনী থাকলে চুরি করা যাবে না। দেখুন ভোটের দিনে কেন্দ্রের চারশ গজের মধ্যে সাংবাদিকদের ঢুকতে দেয়া হয়নি অথচ সরকার দলের লোকজন বুকে ব্যাজ পরে ঘুরে বেড়িয়েছে। পোলিং অফিসাররা আগের দিন রাতে সরকারি দলের প্রার্থীর প্রতীকে সিল মেরে রেখেছে। পরের দিন ব্যালট পেপারে সিল মারার মাধ্যমে আবারও ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। তাই আমাদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা আরো বেড়ে গেছে। অথচ এতো কারচুপির পরও সিইসি বললেন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন হয়েছে। আসলে সরকার ও নির্বাচন কমিশন মুদ্রার এপিট ও ‍ওপিট। এরজন্য জাতির কাছে একদিন তাদের জবাব দিতে হবে।


ঢাকাটাইমস: টানা আন্দোলনে বিএনপির অর্জন কী?


হান্নান শাহ: দেখুন এইসব আন্দোলন দুই মাস তিন মাসে হয় না। অনেক লম্বা হয়। আর সরকার যদি বেহায়া, অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচার হয় তাহলে তারা জনগণের আন্দোলনকে মূল্যায়ন করে না। এছাড়া আন্দোলন তখনই সফল হয় যখন রাজপথ বিরোধী দলের দখলে চলে যায়। কিন্তু বর্তমান সরকার বিশেষ বিশেষ বাহিনীকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত করেছে। তাই এদের হাতে ছাত্র-জনতা, শ্রমিক, নারী, পুরুষ কেউ নিরাপদ নয়। এরা আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড করেছে। সবশেষ ছাত্র ইউনিয়নের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ যে হামলা করেছে এটা জাতির জন্য লজ্জাজনক। তাই এমন সরকারের পতন বা অপসারণের জন্য কিছুটা সময় লাগতে পারে। কিন্তু যেখানে সশস্ত্র বাহিনী মানবতাবিরোধী অস্ত্র ব্যবহার করছে। বেগম খালেদা জিয়ার ওপর পেপার স্প্রে ছুঁড়ে মারছে সেখানে সাধারণ মানুষকে আমরা যুদ্ধের মুখে বা নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ফেলে দেয়া সমীচীন মনে করিনি। আমরা চাই মানুষ মোটিভেটেট হয়ে মনস্তাত্বিতভাবে শতভাগ প্রস্তুত হয়ে একবার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ুক। তাতেই সরকারের পতন হবে।


ঢাকাটাইমস: আন্দোলন নিয়ে বিএনপির ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?


হান্নান শাহ: আন্দোলনের আগে অবশ্যই বিরোধী দলকে সংগঠন জোরদার করতে হবে। মূল শক্তি জনগণকে আরো বেশি করে সম্পৃক্ত করতে হবে। কিন্তু আমি একাই নিধিরাম সর্দার হয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে নিরস্ত্র এক বা দুই ব্যক্তি সফল হবে বলে আমার মনে হয় না। তাই আগে এই কাজগুলো করে আন্দোলনে নামা উচিত হবে বলে আমি মনে করি।


ঢাকাটাইমস: তাহলে বিএনপি কি আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে?


হান্নান শাহ: জনগণ সম্পৃক্ত হয়েছে। তাদের মৌন সমর্থন দিয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে জনগণ যে ভোট দিয়েছে তাতেই প্রমাণ হয়েছে। কারণ বিএনপি যে ভোট পেয়েছে এটা আসল ভোট। আর সরকারি দল যে ভোটের দাবি করছে এটার কোনো লিগ্যালিটি নেই।


ঢাকাটাইমস: মাত্র চার ঘণ্টায় এতো ভোট কি বিশ্বাসযোগ্য?


হান্নান শাহ: অবশ্যই। এই সময়ে যে ভোট পেয়েছি এটা সলিট। আমরা আরো বেশি সময় থাকলে বেশি ভোট পেতাম। আর চার ঘণ্টা তো না। আরো কম সময় হবে। অন্যদিকে সাড়ে আটটা থেকে নয়টার মধ্যে আমাদের সকল এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। তারপরও যারা ভোট দিতে পেরেছে তারা ভোট দিয়েছে। তবে ভোটারদের হয়রানি করা হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে পেট্রল এটম বোমার অভিযোগ দেয়া হয়েছে তারপরও আমাদের প্রার্থী এত ভোট পাওয়ায় প্রমাণ হয়েছে আমাদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়নি। আন্দোলনে জনসমর্থন আছে। আমাদের আন্দোলনে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো-প্রথমত, জনগণের আস্থা পেয়েছি। দ্বিতীয়ত, দেশের বার নির্বাচনগুলোতে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়্। তৃতীয়ত, সরকার এতো ভীতু হয়েছে যে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে দেয় না। অথচ নিজেরা মাঠে ময়দানে রয়েছে এবং সভাসমাবেশ করছে।


ঢাকাটাইমস: সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে বিএনপি আন্দোলনে হোচট খাচ্ছে। এমন বক্তব্যের সঙ্গে কি আপনি একমত?


হান্নান শাহ: অবশ্যই সাংগঠনিক দুর্বলতা আছে। এ শক্তি আরো বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ঢাকা নিয়ে আমাদের অনেক আশা ছিল। এখনও যতটুকু শক্তিশালী অবস্থা থাকা দরকার ততটুকু হয়ে ওঠেনি। সিটি নির্বাচন থেকে আমরা যে অভিজ্ঞতা পেয়েছি আমরা চাচ্ছি নির্বাচনে প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী ও তাদের সমর্থক পেয়েছি। তাই তাদের সঙ্গে নিয়ে এবং যারা পুরানো নেতা আছে তাদের সমন্বয়ে নির্দেশনা পেলে অতিদ্রুত ঢাকা মহানগর বিএনপিকে একটি শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত করতে পারবো। তবে একে আপনারা সংগঠন পুনর্গঠন নয়, পুনর্বিন্যাস বলতে পারেন।


ঢাকাটাইমস: প্রায় একবছরে ঢাকা মহানগর আহ্বায়ক কমিটির কাজের অগ্রগতি কতদূর?


হান্নান শাহ: কাজের অগ্রগতি বললে আপনাকে বুঝতে হবে আমাদের কোথাও কাউন্সিল করতে দেয় না। কারণ ছাড়া বিএনপি করার অপরাধে কর্মীদের গ্রেপ্তার করে হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে কারাগারে নিচ্ছে। সে কারণে আমাদের দারুন বেগ পেতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমরা থেমে নেই।


ঢাকাটাইমস: গণমাধ্যমে খবর এসেছে হাবিব উন নবী খান সোহেল ও তাবিথ আউয়াল ঢাকা মহানগরের দায়িত্বে আসছেন। সংবাদটা কতটুকু ঠিক?


হান্নান শাহ: দেখুন আমি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করবো না। এটা নেত্রীর তরফ থেকে বলা হবে। তবে আমাদের স্থায়ী কমিটিতে যেসব বিষয় আলোচনা হয় তা এটা একটু ভিন্নরকম। তাই বলে যে আমরা কোনো পরামর্শ দিতে পারবো তেমনটা না। এটা এখনো প্রি ম্যাচিউরড।


ঢাকাটাইমস: বিএনপি কি কাউন্সিলরের মাধ্যমে দল পুনর্গঠন করবে?


হান্নান শাহ: আমি আসলে পত্রপত্রিকায় এসব খবর দেখতেছি। কিন্তু একজন অভিজ্ঞ মানুষ হিসেবে বলতে পারি চাইলে শর্ট নোটিশেও পুনর্গঠন সম্ভব। কিন্তু যেখানে আমাদের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ শীর্ষ নেতারা জেলে আছেন সেখানে নিকট ভবিষ্যতে কাউন্সিলের সম্ভাবনা দেখছি না। তবে দলের মধ্যে এ নিয়ে নানা কথাবার্তা চলছে।


ঢাকাটাইমস: তাহলে কিভাবে বিএনপি দল পুনর্গঠন করবে?


হান্নান শাহ: কেউ বলছেন অবিলম্বে জাতীয় নির্বাহী কমিটি বাতিল করে নতুন করে করা হোক। প্রয়োজনে অন্যান্য কমিটির ক্ষেত্রেও এমনটা করা হোক। কিন্তু কাউন্সিলের তো একটা সিস্টেম আছে। কারণ সেখানে কারা আসবে। কাদের কে কোথায় রাখা হবে। চেয়ারপারসনের কতগুলো কোটা আছে সেগুলো দেখতে হবে। এটা আপাতত।


ঢাকাটাইমস: বিএনপি প্রেসার গ্রুপ করতে যাচ্ছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে?


হান্নান শাহ: দেখুন অতীতে যারা প্রেসার গ্রুপে ছিলেন তারা বর্তমানে অনেকে আমাদের সঙ্গে আছেন। সাংবাদিক, চিকিৎসকদের অনেকে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে আছেন। এটা আওয়ামী লীগেও আছে। তবে আলাদা করে করা হবে কিনা এটা আসলে বেগম খালেদা জিয়া ভালো বলতে পারবেন।


ঢাকাটাইমস: আন্দোলনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা মাঠে থাকেন না-তৃণমূলের এমন অভিযোগের ব্যাপারে বক্তব্য কী?


হান্নান শাহ: এটা জেনেশুনে সরকারের প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো হচ্ছে। আমাকে পাঁচবার রাজপথ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মহাখালী থেকে আমাকে গ্রেপ্তার করা হলো সঙ্গে আমার দুই/একজন ব্যক্তিগত লোক ছিল। কই তখন তো কোনো তৃণমূলের কাউকে দেখিনি। হ্যাঁ তবে অনেক চাপের পরও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন।


ঢাকাটাইমস: বিএনপি ভোটবর্জন করলেও জামায়াত নির্বাচনে ছিল। জোটের মধ্যে টানাপোড়েনের কারণেই এমনটা হয়েছে?


হান্নান শাহ: জামায়াতের সঙ্গে আমাদের টানাপোড়েন নয়, সমঝোতার অভাব।সম্প্রতি ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাদের একজন প্রার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম,তাঁর মাধ্যমে দায়িত্বশীলদের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য। কিন্তু কী কারণে সাড়া দেননি তা আমার জানা নেই। তবে একটা জিনিস মনে রাখবেন জামায়াতের সঙ্গে আমাদের জোট জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে। এর আগে তারা উপজেলা নির্বাচনে দলীয়ভাবে প্রার্থী দিয়েছে। তবে জামায়াত নিজেদের যতটা বড় মনে করে, ভোটাররা তত বড় মনে করে নাই। একই অবস্থা জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রেও। কারণ আমাদের অনেক কাউন্সিলর প্রার্থীর চেয়েও তাদের মেয়র প্রার্থী কম ভোট পেয়েছে।


ঢাকাটাইমস: জামায়াত নিষিদ্ধ হলে বিএনপিকে জোটে রাখবে?


হান্নান শাহ:  কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে বিএনপি নয়, কোনো রাজনৈতিক দল সম্পর্ক রাখতে পারে না। এটা আইন পরিপন্থি।


ঢাকাটাইমস: আগামী দিনে কী প্রত্যাশা করেন?


হান্নান শাহ: আমি প্রত্যাশার জায়গা তো বলবো না, আশা বলবো। ‘ধন্য আছো কুহকিনী তোমার মায়ায়, মুগ্ধ মানবের মন মুদ্ধ ত্রিভূবন। দুর্বল মানব মন্দিরে তোমায়।’ দুর্বলতা অনেক। এই দুর্বলতার জন্যই বিএনপিকে বারবার খেসারত দিতে হচ্ছে। তা না হলে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যিনি দেশের প্রচলিত সব নিয়ম কানুন ভেঙে সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ড করলো পরবর্তী সময়ে বিএনপি তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিলো না। কেন এই দুর্বলতা জানি না। তবে এক্ষেত্রে বর্তমান সরকার অনেক দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করেছে। কোনো পরোয়াই করে নাই। তারা তাদের প্লান অনুযায়ী কাজ করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের মন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছিলেন, আমরা জনগণের জন্য কাজ করতে নয়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য। তারা সেটা করছে। কিন্তু বিএনপি সেটা করেনি।


ঢাকাটাইমস: আপনাকে ধন্যবাদ।


হান্নান শাহ: ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকেও ধন্যবাদ।


(ঢাকাটাইমস/১৩মে/বিইউ/এআর/ ঘ.)