তিউনিশিয়ার তরুণ কম্পিউটার প্রকৌশলী বউকুজিজি। গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে চাহিদা মতো চাকরি না পেয়ে তীব্র হতাশ ছিলেন তিনি। হতাশা থেকেই একদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রকাশ্যে আত্মহনন করেন বউকুজিজি। তার এই ব্যতিক্রম প্রতিবাদ, সর্বোচ্চ ত্যাগ তিউনিশিয়ার তরুণ প্রজন্মকে উত্তাল করে। তাৎক্ষণিক শুরু হয় গণআন্দোলন। ব্যাপক আন্দোলনের মুখে তিউনিশিয়া সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তিউনিশিয়ার জনগণের এই সাফল্য সারা আরব অঞ্চলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ফলে খুব দ্রুত আরব অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পর্যায়ক্রমে আক্রান্ত হতে থাকেন আরব বিশ্বের অগণতান্ত্রিক শাসকরা।
আরব বসন্ত নামের এই গণআন্দোলন সহসাই বিস্ফোরিত হয় ইয়েমেন, মিশর এবং বাহরাইনে। গণপ্রতিরোধের মুখে ইয়েমেনের শাসক দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। মিশরের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারক ক্ষমতাচ্যুত হন। অন্যদিকে বাহরাইনের সংখ্যালঘু সরকারের ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দেয় আরব বসন্ত। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ব্যাপক আন্দোলনে বাহরাইন সরকারের পতন যখন প্রায় নিশ্চিত, তখন সৌদি আরব তার আদর্শিক মিত্র বাহরাইনকে রক্ষায় সেখানে সেনাবাহিনী পাঠায়। বস্তুত সৌদি সেনা হস্তক্ষেপে বাহরাইনের রাজতান্ত্রিক সরকার রেহাই পায়। কিন্তু সেখানে গণঅসন্তোষ এখনো বিদ্যমান। যেকোনো মুহূর্তেই বাহরাইনে আবার গণবিস্ফোরণের আশঙ্কা আছে।
এর মধ্যেই আরব বসন্তের ঢেউ লাগে লিবিয়ায়। এখানে আন্দোলন ছড়ায় ব্যতিক্রম পন্থায়।
সমৃদ্ধ ও সম্পদশালী দেশ লিবিয়ার জনগণ কর্নেল গাদ্দাফির শাসনের প্রতি অনুগতই ছিল। দেশটির অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার এই চিত্র আরব বসন্তের অন্তরালের কুশীলবদের জানা। তাই মুষ্টিমেয় লিবিয়ার মানুষকে সশস্ত্র প্রক্রিয়ায় আন্দোলনে নিযুক্ত করা হয়। ফলে লিবিয়ায় নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিবর্তে সামরিক উসকানি ছিল লক্ষণীয়। বস্তুত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে লিবিয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এই সশস্ত্র গ্রুপের এলোপাতাড়ি কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত লিবিয়াতে ন্যাটোর সামরিক হস্তক্ষেপের পথ পরিষ্কার করে। এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মতামত উপেক্ষা করে লিবিয়ায় আক্রমণ করে ন্যাটো জোট। এর মধ্যদিয়ে গাদ্দাফির পতন ঘটলেও লিবিয়ার জনগণের মুক্তির আশা দুরাশায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের অভিপ্রায় এতে পূরণ হয়।
পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপে গাদ্দাফি উত্তর লিবিয়ার শাসন ব্যবস্থা আমূল পাল্টে যায়। জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশটির জাতীয় সম্পদে মার্কিন কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। লিবিয়ার রাষ্ট্র ব্যবস্থা ধ্বংসের মধ্যদিয়ে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সমীকরণে মার্কিন আনুকূল্য নিশ্চিত করে। ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের এই বিবর্তন ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় মার্কিন সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পূর্বাপর আকাক্সক্ষা প্রসারিত হয়। এ পর্যায়ে আরব বসন্তের দাবানল ক্রমেই সম্প্রসারিত হয় লেভান্ট অঞ্চলে। বস্তুত ২০১১ সালের মার্চেই আক্রান্ত হয় মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি সিরিয়া।
মজার বিষয় হচ্ছে, সিরিয়াতেও সামান্য সংখ্যক মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়। কিন্তু যৎসামান্য অজ্ঞাত রাজনৈতিক গ্রুপ স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই ব্যাপক সন্ত্রাসী কার্যক্রম ছড়ায়। এ সময় সিরিয়ার বিদ্রোহীদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন দেয় যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও তুরস্ক। উপরোক্ত দেশসমূহ ছাড়াও কয়েকটি ইউরোপীয় এবং আঞ্চলিক দেশের প্রত্যক্ষ মদদে বিদ্রোহীরা ক্রমাগত সিরিয়ার সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকে। মার্কিন কারসাজিতে সেখানে গত বছর আবির্ভূত হয় জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস। ভয়ংকর আইএসের বর্বরতা লেভান্ট অঞ্চলের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায়। ফলে সিরিয়াকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য সংকট হয় আরও ঘনীভূত হয়। পরিস্থিতির সুযোগে আইএস দমনের কথিত তৎপরতায় অংশ নেয় মার্কিন মিত্র জোট। এই বিমান হামলা পক্ষপাতদুষ্ট। মূলত কৌশলে সিরিয়ায় সরকারি বাহিনীর শক্তির উৎস ভেঙে দিতেই সচেষ্ট ছিল মার্কিন মিত্র জোট। ফলে সন্ত্রাসীদের বিচরণ নির্বিঘœ হয় লেভান্ট অঞ্চলে, বিপরীতে কোণঠাসা হয়ে পড়ে সিরিয়ার সরকার।
সিরিয়া পরিস্থিতির ক্রমাবনতি আরব বসন্তের আবেদনে সীমাহীন হতাশার উৎপত্তি করে। বিশ্বশক্তিগুলোর একতরফা ভূমিকায় আসাদ সরকারের পতন প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠে। এ পর্যায়ে রুশ সামরিক হস্তক্ষেপ সিরিয়ার সরকারকে শক্তি যোগায়। রুশ সামরিক সহায়তায় সিরিয়া নিজের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়। পাশাপাশি ব্যাপক পুনর্গঠন এবং সামরিক অস্ত্রপাতি মোতায়েন করে দেশটি। এই বাস্তবতায় সিরিয়াবিষয়ক মার্কিন অভিপ্রায় তীব্র হোঁচট খায়। প্রশ্ন হচ্ছে আরব বসন্ত কি দিল আরবদের? যে লক্ষে আরব তরুণরা জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল তার ফলাফল কি? এই প্রশ্নের উত্তর আরব নেতৃত্বের কাছেই আছে। এর উপযুক্ত উত্তর একদিন আদায়ও করবে আরবরা। কিন্তু যে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত, আঞ্চলিক বিভাজন, সীমাহীন রক্তপাত ঘটল আরব বসন্তে তা কি পোষানো যাবে?
আরব বসন্তের ফলে লিবিয়া নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে তার জাতীয় সম্পদে। বিশ্বের ৬৬ শতাংশ জ্বালানি মজুদ এলাকার অবস্থা অনেকটাই লিবিয়ার মতো। সিরিয়া ইরানের সম্মিলিত সামরিক শক্তির ক্ষয় হয়েছে। যেটি বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বপ্ন বিলীন করবে সৌদি-ইরান দ্বন্দ্ব। আর এর সব কিছুর জন্যই দায়ী আরব বসন্ত। কিন্তু এই বসন্ত শুরুর আগে আরবরা এ ফলাফলের কথা কখনই অনুমান করতে পেরেছিলেন কিংবা তারা জানতেন যে, এই আরব বসন্তের কারণেই বিশ্বযুদ্ধের মুখে পড়বে দুনিয়া?