বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ইংরেজী ১৮৯৯ খৃষ্টাব্দের ২৫শে মে, মঙ্গলবার, কাজী নজরুল ইসলাম পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র আট বছর বয়সে পিতা ফকির আহমদকে হারান। পয়সাকড়ির অভাবে লেখাপড়া করা যাচ্ছিল না। এদিকে গান বাজনায় ঝোঁক ছিল। তাই নামমাত্র লেখাপড়া করে স্থানীয় “লেটো” গানের দলে যোগ দেন। কিছুদিন গান করার পর মনে হয়, এরকম গান তো তিনিও বানাতে পারেন। তাই গান লিখতে থাকলেন। ঐ অত অল্প বয়সের লেখা গানে তখনই অনেকের কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু আয়ে কুলাচ্ছিল না বলে তিনি গ্রামের হাজী পাহালওয়ান শাহের মসজিদে খাদেমগিরি শুরু করেন। ওর সঙ্গে মাজারে সাঁঝের বাতি দেওয়ার কাজটাও করতে হতো। তাতেও সুবিধে হচ্ছিল না বলে তিনি মিলিটারীতে যোগ দেন ১৯১৭ সালে, ৪৯ নং বাঙ্গালী পল্টনে এবং করাচিতে চলে যান। সেখানে একজন পাঞ্জাবী মৌলভী সাহেবের কাছে “দেওয়ান-ই-হাফিজ” ও পারসী ভাষার নানা কাব্যগন্থের শিক্ষালাভ করেন। এভাবেই তিনি প্রথম মহৎ সাহিত্যের সংস্পর্শে আসেন, এর গভীরে প্রবেশ করার সুযোগ পান। বস্তুতঃ এক মহাজীবনের সন্ধানে ঢোকার সিড়ি পেয়ে যান। আরব সাগরেরপাড়ে, এই করাচীতে বসে তিনি “মুক্তি”, “কবিতা সমাধি”, “রিক্তের বেদন”, “ব্যথার দান”, “হেনা” নামের অসাধারণ ও বিষ্ময়কর কবিতা ও গল্প রচনা করেন। সমজদার পাঠক মন্ডলী বুঝতে পারছিলেন বাংলাসাহিত্যে এটি আর এক অভাবনীয়, মহাশক্তিধর প্রতিভার আগমনের পদধ্বনি।
“বাঙ্গালী পল্টন” ভেঙ্গে দেওয়া হলে তিনি বর্ধমানের সাব-রেজিস্ট্রার-এর পদের জন্য দরখাস্ত করেন। তারপর তিনি কলকাতায় এসে প্রথমে সতীর্থ শৈলজানন্দ মুখ্যোপাধ্যায়ের মেসে ওঠেন। পরে কলকাতা মেডিকেল কলেজের সামনে ৩২নং কলেজ স্ট্রীট, “বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি”র কার্য্যালয়ে ওঠেন। এখানে “বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা”র সম্পাদক, কমরেড মোজাফফর আহমেদ ও “মোসলেম ভারত” পত্রিকার কর্ণধার আফজালুল হক ও থাকতেন। এর পাঁচ ছয় মাস পরে তিনি হঠাৎ কুমিল্লা চলে যান। তাঁর বেশঅন্তরঙ্গ বন্ধু, সুগায়ক শ্রী নলিনীকান্ত সরকারের কথা গল্পচ্ছলে এভাবে বলা যায়, “নজরুলের প্রাত্যহিক গতিবিধি ও কার্য্যসূচীর সন্ধান আগে থেকেই আমার জানা থাকত। একদিন সারা বিকেলটা তার সঙ্গে আড্ডা দিয়ে পরদিন সকাল বেলায় গিয়ে দেখি, নজরুল ঘরে নেই। তাঁর এক সহকক্ষবাসী বন্ধু (মোসলেম-ভারতের আফজালুল হক) হাসতে হাসতে বললেন, ‘সে তো কাল রাত্তিরে কুমিল্লা চলে গেছে’। আমি বললাম, কৈ, কিছু কাল তো কিছু বললেন না। ‘বলবে কি করে? কাল সন্ধ্যার পর এক ভদ্রলোক এসে কি সব কথাবার্তা ক’য়ে কুমিল্লা যাবার প্রস্তাব করলেন। প্রস্তাব, অনুমোদন, সমর্থন সব মূহুর্তের মধ্যে শেষ করে সঙ্গে সঙ্গে শিয়ালদহ ষ্টেশনে যাত্রা”।ঐ ভদ্রলোকের নাম আলী আকবর খান, কুমিল্লার দৌলতপুর নিবাসী বিখ্যাত প্রকাশক।দৌলতপুর যাবার পথে খান সাহেব নজরুলকে নিয়ে কয়েকদিন কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে শ্রী ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে থেকে যান। তিনি কুমিল্লা বোর্ড অফ ওয়ার্ডেস-এর ইন্সপেক্টর হিসেবে কাজ করতেন। ইন্দ্রকুমারের ছেলে বীরেন্দ্রকুমার, কুমিল্লা জেলা স্কুলে পড়ার
সময় আলি আকবর খানের ক্লাসমেট ছিলেন। পরষ্পরের বাড়ীতে গতায়াত ছিল। বীরেন্দ্রকুমারের বাড়ীতে স্ত্রী, বোন, ছেলে ও বাবা মা ছাড়াও আরো থাকতেন বিধবা পিসী গিরীবালা দেবী ও তাঁর একমাত্র কন্যা প্রমীলা তথা আশালতা সেনগুপ্তা, যার ডাকনাম দুলী। আশালতার স্বর্গীয় পিতা, শ্রী বসন্তকুমার সেনগুপ্তের আদি নিবাস ছিল মানিলগঞ্জের তেহুতা গ্রামে। তিনি ত্রিপুরা সরকারের নায়েবের পদে চাকুরী করতেন। পিতার মৃত্যুর পর প্রমীলারা কুমিল্লায় বীরেন্দ্রকুমারদের বাড়ীতে চলে এসে সেখানেই বসবাস করছিলেন।
কয়েকদিন পর নজরুলকে সঙ্গে নিয়ে আলি আকবর সাহেব তাঁর দৌলতপুরের বাড়ীতে পৌঁছান। খান সাহেবের দু’জন বিধবা বোন ছিলেন। একজন তাঁর সংসারের সর্বময় কর্ত্রী ছিলেন। তিনি নজরুলকে মায়ের স্নেহে আদর যত্ন করতেন। একছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে অন্য বোনটীও কাছাকাছি থাকতেন। মেয়েটী যুবতী ও বেশ সুন্দরী ছিল। নজরুল এ বাড়ীতে আসার পর তাদের যাতায়াত বেড়েযেতে থাকে। সম্ভবতঃ নজরুলের বাঁশী ও মেয়েটীর রূপ যৌবন পরস্পরকে আকৃষ্ট করেছিল।মেয়েটির নাম সায়ীদা খাতুন, ওরফে নার্গিসবেগম। কিছুদিনের মধ্যে তাঁদের বিয়ের কথা পাকাপাকি হয় ও বিয়ের দিন ধার্য্য হয়। কুমিল্লার সেই পল্লীগ্রাম থেকে নজরুল ইসলাম ও খান সাহেব তাঁর বিয়ের খবর জানিয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের উপস্থিতির আমন্ত্রণ পাঠান। খান সাহেবের উপর অনেকেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তদুপরি উঠতি বয়স, স্পর্শকাতর মন ও স্থিতিশীল আয়ের কোন ব্যবস্থা না থাকায়, বিয়ে করে এক বিরাট দায়ীত্ব নজরুল কেমন করে সামলাবেন, তা নিয়ে তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধুবান্ধব ও হিতৌষীরা দারুণ উদবিগ্ন বোধ করেন। কিন্তু যে ভাবেই হোক, সাহস করে কেঊ এর বিরোধীতা করতে পারেন নি।
পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় এক চিঠিতে (৫ইং জুন, ১৯২১) নজরুলের চিঠির জবাবে লেখেন, “ভাই নুরু, যখন তুই স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে তাকে বরণ করে নিয়েছিস, তখন অবশ্য আমার কোন দুঃখ নেই। তবে একটা কথা, তোর বয়স আমাদের চাইতে ঢের কম, অভিজ্ঞতাও তদরূপ, ফিলিং বা অনুভুতির দিকটা অসম্ভব রকম বেশী। কাজেই ভয় হয় যে, হয়তো বা দুটো জীবনই ব্যর্থ হয়। এ বিষয়ে তুই যদি কনসাস তাহলে অবশ্য কোন কথা নেই। যৌবনের চাঞ্চল্যে আপাত-মধুর মনে হলেও ভবিষ্যতে না পস্তাতে হয়। লিখেছিস, এক পল্লী বালিকার কাছে এত বিব্রত আর অসাবধান হয়ে পড়েছি যাকোন নারীর কাছে কখনো হইনি। জেনে খুশী হলাম যে , তাঁর বাইরের ঐশ্বর্য্যও যথেষ্ট আছে”। “মোহাম্মদী” পত্রিকার সম্পাদক ওয়াজেদ আলী সাহেব লেখেন, “ অভিন্ন হৃদয়েষু ভাই নজরুল, আপনার ৭ তারিখের স্নেহমাখা চিঠিখানি আজ বিকালে পেয়ে কয়েকবার পড়েছি ও অশান্তির মধ্যেও হেসেছি। পল্লীর যে কুটীরবাসিনীর (দৌলতপুরের দৌলতখানার শাহজাদী বলাই বোধ হয় ঠিক, তাই না?) সাথে আপনার মনের মিল ও জীবনের যোগ হয়ে গেছে তাঁকে আমার শ্রদ্ধা ও প্রীতিপূর্ণ আদাব জানাবেন। আমার বোধ হয় আপনার বন্ধুরা অসন্তুষ্ট হয়েছেন একটা কারণে। আপনি “নারায়ণে” “দহনমালা” লিখে নারীর কাছে ক্ষমা চাইলেন, তার পরেই এত সত্বর প্রেমের ফাঁদে ধরা পড়লেন?” যৌবনের জোয়ার বড় সাংঘাতিক; তাকে ঠেলে রাখা বড় দায় – এ আমি স্বীকার করছি”। এরপর ১৬ইং জুন তারিখে আবার লেখেন, “ভাই নজরুল, আপনার আগের চিঠির জবাব আগেই দিয়েছি। আজ এই কতক্ষণ হলো, রবিবারের চিঠিটাও পেলাম। আপনার বিয়ের খবরটা তাড়াতাড়ি এই সপ্তাহের কাগজে বের করে দিয়েছি। কিন্তু ভয় নেই। আপনার শ্রীমতির কোন নামই কাগজে ছাপা হয়নি”।
২৫ শে জুন কলকাতা থেকে মোজাফফর সাহেব লেখেন, “ভাই কাজী সাহেব। ওয়াজেদ মিয়ার চিঠিতে জানলাম যে, ৩রা আষাঢ় তারিখেই আপনাদের বিবাহ হচ্ছে। সময় খুবই সংকীর্ণ-কাজেই আমার আর যাওয়া হচ্ছে না। তবে ভালয় ভালয় সব মিটে যাক, এ প্রার্থনা খোদার দরগাহে”। পরের দিন খুব গোপনীয় একটা চিঠিতে লিখলেন, “পরম প্রীতিভাজনেষু কাজী সাহেব, আপনার পত্রাদি আর মোটেই পাওয়া যাইতেছে না, তার কারণ কি? খান সাহেবের নিমন্ত্রণপত্র পাইয়াছিলাম। পত্রখানা আপনারই মুসাবিদা করা দেখিলাম। পত্রের ভাষা দু’এক জায়গায় বড় অসংযত হইয়াছে। একটু যেন দাম্ভিকতা প্রকাশ পাইয়াছে। আপনার হাত দিয়া অমন লেখা বাহির হওয়া কিছুতেই ঠিক হয় নাই। আমার ভয় হইতেছে যে, খান সাহেবের সংশ্রবে থাকিয়া আপনি না শেষে দাম্ভিক হইয়া পড়েন। অন্যে বড় বলিলে গৌরবের কথা হয়, আর নিজেকে নিজে বড় বলিলে অগৌরবের মাত্রাই বাড়িয়া যায়। মোহাম্মদী (পত্রিকা)-কে বিবাহের কথা ছাপিতে অনুরোধ করাটা ঠিক হইয়াছে কি? তাঁরা তো নিজ হইতেই ও খবর ছাপিতে পারিতেন। ......বাস্তবিক আমার প্রাণে বড় লাগিয়াছে বলিয়া এত কথা বলিলাম। এই নিমন্ত্রণপত্র আবার “অপুর্ব নিমন্ত্রণপত্র” শিরনামে “বাঙালী” (পত্রিকা) তে মুদ্রিত হইয়াছে দেখিলাম। “বাঙালী”কে এই নিমন্ত্রণপত্র কে পাঠাইল? – আপনার অঙ্কলক্ষ্মীকে এই অপরিচিতের বিনয় সম্ভাষণ জানাইবেন”।মুদ্রিত নিমন্ত্রণনজরুলের পিতা মরহুম কাজী ফকির আহমদ সাহেবের পরিচয় দেওয়া হয় চুরুলিয়ার “আয়মাদার” বলে। আর নজরুলকে বলা হয় “মুসলিম রবীন্দ্রনাথ”। সম্ভবতঃ এই দুটী কথা মুজাফফর সাহেবকে ব্যাথিত করেছিল। মুজাফফর সাহেব ২১শে জুন নজরুলের মামাশ্বশুর, মানে আলী আকবর সাহেবকে লেখেন, “খান সাহেববিবাহের নিমন্ত্রণপত্র পাইয়াছি, অবশ্য হইয়া যাওয়ার পরে। আগে পাওয়া গেলেও বোধ হয় স্ট্রাইকের জন্য যাওয়া তেমন সুসাধ্য হইত না। যাহা হউক আশা করি ভালয় ভালয় শুভ কাজ শেষ হইয়া গিয়াছে”। তিনি গোয়ালন্দ–চাঁদপুর স্টীমার ও আসাম–বেঙ্গল রেলওয়ে কর্মচারীদের স্ট্রাইকের কথাই বোঝাতে চাচ্ছিলেন।
যাই হোক, এত ঢক্কানিনাদ করে যে বিয়ে, সেটার অঙ্কুরেই বিনষ্টি ঘটে। দৌলতপুরে আলি আকবর খান সাহেবের কিছু কিছু ব্যাবহার নজরুলকে মানসিক ভাবে আঘাত করে। হবু বধুর কিছু আচরণও তাঁর কাছে দুর্ব্যবহার বলে মনে হয়। অবস্থা সুবিধের নয় দেখে ও নিজের দোষ কাটাবার অভিপ্রায়ে খান সাহেব বিয়েটা ভেঙ্গে দেবার ফন্দি করেন। হঠাৎ একটা নতুন প্রস্তাব এনে বলেন,বিয়ের পরে নজরুলকে দৌলতপুরেই থেকে যেতে হবে, যেটা নজরুলের পক্ষে কোনমতেই মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। নজরুলের বিশেষ আমন্ত্রণে বিরজাসুন্দরী দেবী নৌকাযোগে দৌলতপুরের বিয়ে বাড়ীতে আসেন। সঙ্গে সেনগুপ্ত পরিবারের আরো ১০-১১ন জন সদস্যও আসেন। নজরুল যখন তাঁর ঐসব অপমানের কথা বিরজাসুন্দরীকে জানান, তখন তিনি এ বিয়ে না করার জন্য পরামর্শ দেন। কিন্তু বিয়ে উপলক্ষে অত লোকজন অলরেডী উপস্থিত হয়ে গেছে , বিয়েটা ভেঙ্গে না দিয়ে যে ভাবেই হোক নজরুল ঝামেলাটা চুকিয়ে দেবার মনস্থ করেন এবং বিয়েটা শেষ পর্য্যন্ত সম্পন্ন হয়।আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়েটা হয়েছিল সত্য, কিন্তু ইসলামী মতে তা কনজুমেটেড হয়নি। অর্থাৎ তাঁদের দাম্পত্য মিলন সাধিত হয়নি। বিয়ের রাতেই সেই প্রচন্ড ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্যেই নজরুল দৌলতপুর ত্যাগ করেন। মনে করা হয় তিনি সেনগুপ্ত পরিবারের সঙ্গে গিয়ে কান্দিরপাড়ে ওঠেন।সেই কান্দির পাড় থেকে তিনি দু’টী গুরুত্বপূর্ণ চিঠি লেখেনঃ
প্রথম চিঠিটী তিনি খান সাহেবকে “মামাশ্বশুর” না বলে “বাবাশ্বশুর” বলে সম্বোধন করে লেখেন, “ বাবা শ্বশুর! আপনাদের এই অসুর জামাই পশুর মতন ব্যবহার করে এসে যা কিছু কসুর করেছে, তা ক্ষমা করুন সকলে। অবশ্য যদি আমার ক্ষমা চাওয়ার অধিকার থাকে। এইটুকু মনে রাখবেন, আমার অন্তর দেবতা নেহায়েতঅসহ্য হয়ে না পড়লে, আমি কখনও কাউকে ব্যথা দিই না। ...আমিও আপনাদের মতো মানুষ। আমার গন্ডারের চামড়া নয়, কেবল সহ্যগুণটা কিছু বেশী। আমার মান-অপমান সম্বন্ধে কান্ডজ্ঞান ছিল না বা “কেয়ার” করিনি বলে আমি কখনো এতবড় অপমান সহ্য করিনি, যাতে আমার “ম্যানলিনেসে” বা পৌরুষে গিয়ে বাজে - যাতে আমাকে কেঊ কাপুরুষ, হীন ভাবতে পারে। আমি সাধ করে পথের ভিখারী সেজেছি বলে লোকের পদাঘাত সইবার মতন “ক্ষুদ্র আত্মা” হয়ে যাইনি। আপনজনের কাছ হতে পাওয়া অপ্রত্যাশিত এত হীন ঘৃণা, অবহেলা আমার বুক ভেঙ্গে দিয়েছে। বাবা! আমি মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। ...বাড়ির সকলকে দস্তুরমতো সালাম-দোয়া জানাবেন-তাকেও ক্ষমা করতে বলবেন, যদি এ ক্ষমা চাওয়া ধৃষ্টতা না হয়। আরজ-ইতি। চীর-সত্য স্নেহ-সিক্ত – নুরু।
দ্বিতীয় চিঠিটা তিনি কলকাতায় মুজাফফর সাহেবকে লেখেন। সেই চিঠি পেয়ে মুজাফফর আহমেদ অনেক কষ্ট করে কুমিল্লা এসে (তখন রেল ধর্মঘট চলছিল) নজরুলকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা ফেরত যান। এর অল্পদিন পর ৩/১ সি তালতলা লেনে মুজাফফর সাহেবের বাড়ীতে থাকা অবস্থায় নজরুলের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এরপর নজরুল প্রায় তিন বছর ধরে কয়েকবার কান্দির পাড় গিয়েছেন। শেষমেষ ১৯২৪ সালের ২৪শে এপ্রিল, কলকাতার হাজি লেনে, আশালতা সেনগুপ্ত ওরফে প্রমীলার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তবে ঝক্কি ছিল। কনের বয়েস ১৮ বছরের বেশ কম ছিল বলে অফিসিয়্যালি হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে, অর্থাৎসিভিল ম্যারেজ হতে পারেনি। অগত্যা ইসলামী মতেই বিয়েটি হয়। এ জটিলতায় হিন্দু, মুসলনমানউভয় সম্প্রদায়ের লোকেরা চটে যান। আশালতার ডাকনাম ছিল”দোলনা দেবী”, সংক্ষেপে “দুলী”। দোলনার গায়ের রঙচাঁপাকলির মতো ছিল বলে নজরুল তাঁর দ্বিতীয় কাব্যের নাম দিয়েছিলেন “দোলন চাঁপা”।দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দেবার পর থেকে প্রমীলাদেবী পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হয়ে বহুদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। কবি প্রায় তাঁর সর্বস্ব দিয়ে স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে থাকেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ অল্পদিনের মধ্যে দারুণ অসুস্থ হয়ে তিনি নিজেও শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। দীর্ঘ ৩৮ বছর সংসার করার পর, ১৯৬২ সালের৩০শে জুন, শনিবার, মাত্র ৫২ বছর বয়সে প্রমীলা দেবী তাঁর কলকাতার পাইকপাড়ার বাসাতে শেষ নিঃশ্বাস
ত্যাগ করেন। সে সময় কলকাতার মির্জাপুর স্ট্রীটে নজরুল পাঠাগার ছিল। সেখানে নজরুল জয়ন্তী হতো। ফাংশান শেষে দলবল মিলে পাইক পাড়ায় গিয়ে কাজী সাহেবদের দেখে আসার একটা অলিখিত রেওয়াজ ছিল। প্রমীলা দেবীর মৃত্যুর ঠিক আগের বছর, ১৯৬১ সালের নজরুল জয়ন্তীর পর দলের সাথে গিয়ে পাইকপাড়ায় বাসায় নজরুল দম্পতীকে পাশাপাশি খাটে শোওয়া অবস্থায় (নজরুল বসে ছিলেন কিনা মনে নেই) দেখার বিরল সৌভাগ্য আমার হয়েছে (আমি তখন যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং এ প্রথম বছরের ছাত্র)।
পরের দিন রবিবার, কবির অনেকদিনের অভিলাষ অনুযায়ী কবিপত্নীর মৃতদেহটি কলকাতা থেকে চুরুলিয়া নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেই হাজী পাহালোয়ানের দরগার পাশে কবরস্থ করা হয়। প্রমীলা দেবী বাল্যকাল থেকেই সাহিত্য ও সঙ্গীতের ভীষণ অনুরক্ত ছিলেন। তাঁর কিছু কবি্তা মাসিক “সওগাত” ও দ্বিমাসিক “সাম্যবাসী” তে ছাপা হয়। যতদিন পেরেছেন, ঐ অচল অবস্থাতেও তিনি নিজ হাতে স্বামীকে খাইয়ে দিতেন।কবির ভক্ত ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে তিনি একান্ত আপনজনের মতো ব্যবহার করতেন। সাংসারিক অসচ্ছলতার মধ্যেও তিনি কাউকে অভুক্ত অবস্থায় ফেরত দেননি। কখনও বিমর্ষ থাকেন নি বা কোন অভিযোগ করেন নি।
প্রথমা স্ত্রী নার্গিস খানের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হলেও নজরুল তাঁকে কখনও ভুলতে পারেন নি। অত অল্প বয়েসে তিনি “শ্যাম রাখি না কূল রাখি”র মতো বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পড়ে, স্বামীর সঙ্গে ঔ রাত্রেই বাড়ী ছেড়ে চলে যাবেন, না পিতৃকুলের সম্মান রক্ষা করবেন, বুঝে উঠতে পারেন নি। কিন্ত তিনি হাল ছাড়েন নি। নিজেকে প্রস্তুত করতে তিনি ঢাকায় গিয়ে কামরুন্নেছা গার্লস কলেজে পড়াশুনা করেন। তিনি “তাহমিনা”, “ধুমকেতু” ও “পথিক হাওয়া” নামে তিনটি উপন্যাস ও কয়েকটি টেক্সট বুক লেখেন। “তাহমিনা “সোহরাব রুস্তম” উপন্যাসের অনুকরণে লেখা হয়েছিল।তাহমিনাকে রেখে রুস্তম যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে চলে যান, ঠিক তেমনই নজরুল নার্গিসকে রেখে চলে গিয়েছিলেন। নার্গিসের জীবন যেন তাহমিনার অনন্ত দুঃখ দুর্দশা ও বঞ্চনার ইতিহাস। সব কটা উপন্যাসই ছিল নজরুলকে ঘিরে।
দীর্ঘ ১৬ বছর প্রতীক্ষার পর ১৯৩৭ সালের ৪ঠা নভেম্বর নার্গিস তাঁর মামার বন্ধু, ময়মনসিংহবাসী প্রফেসর হেলালুদ্দিন ও মামাতো ভাই নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতার শিয়ালদহ হোটেলে শেষ সাক্ষাত করেন। সাক্ষাতকালে মীঃ ওয়াজেদ আলীও ছিলেন। অতর্কিতে এঁদেরকে দেখে নজরুল ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। প্রথমে দু’জনের কেউ কথা বলতে পারেন নি। পরে একটু ধাতস্থ হয়ে নজরুল নার্গিসকে বলেন, “তুমি ঢাকা ফিরে যাও।আমি খুব সত্বর ঢাকায় আসছি, সেখানেই এর একটা সমাধান করবো। তিনি সাংসারিক নানা অসচ্ছলতার কথা এবং দুঃখ দুর্দশাময় ভবিষ্যতের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি এও উল্লেখ করেন যে, প্রমীলা ও তার মা সংসারে নার্গিসকে বরদাস্ত করবেন না। অবশ্য নার্গিসের ভাষায়, “সেই সত্বর আর কখনো আসেনি”। পরবর্তিকালে নার্গিস, নজরুলের অনুরক্ত ও ঘনিষ্ট কবি আজিজুল হাকিমকে বিয়ে করেন। তিনি ১৯৮৫ সালে, প্রায় ৮১ বছর বয়সে আমেরিকার এক ছোট শহরে মারা যান।
আর দেখা না হলেও নজরুল তাঁর পরিত্যক্ত পত্নীকে এক অবিস্মরনীয় পত্র লেখেন । তার কিছুটা অংশ নীচে দেওয়া হলোঃ “কল্যাণীয়াষু, তোমার পত্র পেয়েছি - সেদিন নববর্ষার নব ঘন-সিক্ত প্রভাতে। পনর বছর আগে এমনি এক আষাঢ়ে এমনি বারীধারার প্লাবন নেমেছিল – তা তুমি হয়তো স্মরণ করতে পারো। ......তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কি অসীম বেদনা। তুমি এই
আগুনের পরশমানিক না দিলে আমি অগ্নিবীণা বাজাতে পারতাম না – আমি ধুমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না। তোমার যে কল্যাণরূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথমে দেখেছিলাম, যে রূপকে আমার জীবনের সর্বপ্রথম ভালবাসার অঞ্জলী দিয়েছিলাম, সে রূপ আজও স্বর্গের পারিজাত-মন্দারের মতো চির অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে”।
ইতি। নিত্যশুভার্থী, নজরুল ইসলাম।
কৃতজ্ঞতাঃ নজরুল রচনা সম্ভার, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া।